‘ইচ্ছে ছিল অভিনয়শিল্পী হবো, যেহেতু পড়াশোনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে। মঞ্চ নাটক নিয়ে আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। জাতীয় শিশু একাডেমি থেকে তিনবার অভিনয়ে প্রথম হই। বাবা আমার ইচ্ছেকে খুব মূল্যায়ন করতেন’- এভাবেই বলছিলেন সাজিয়া আফরিন।

সাজিয়া লুবনা আফরিন

পছন্দ এবং ইচ্ছে ছিল অভিনয়, তবে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে কেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পড়ার একটি অংশ ছিল কস্টিউম ডিজাইন, সেখান থেকেই ফ্যাশন ডিজাইনিং এর প্রতি ভালোলাগা এবং ভালোবাসা। মাস্টার্স শেষ করে কম্পিউটারের একটি কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলাম। কিন্তু সেসব কাজ আমার ভালো লাগেনি, টানেনি। ২০০২ এ একটি বুটিক হাউজ খুলি। ওখান থেকেই আবার স্বপ্ন দেখা শুরু।

পোশাক পরিকল্পনার শুরুটা…?

শুরুটা ঠিক করেছিলাম ১৯৯৪-৯৫ এ, নাগরিকের একটি মঞ্চ নাটকে। সেখানকার পুরো কস্টিউম ডিজাইন আমি করি। সিসিমপুরে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। ২০০৭ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সিসিমপুরের পোশাক পরিকল্পনার সুযোগ পেয়েছিলাম। ‘মনপুরা’ সিনেমার পোশাক পরিকল্পনা করেছি, শিখেছি অনেক কিছু। সিনেমার গল্প, অভিনয় শিল্পীদের গড়ন, সিনেমার প্ল্যাটফর্ম নানা বিষয় মাথায় নিয়েই কাজটি করতে হয়েছে। মনপুরাতে প্রকৃতির সব রঙ ঢেলে সাজিয়েছি। আলভি আহমেদের কর্মাশিয়াল সিনেমা ‘ইউটার্ন’ এর পোশাক পরিকল্পনা করেছি। দীপ্ত টিভির পোশাক পরিকল্পনার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। অনেকগুলো কাজের ভিড়ে ‘অপরাজিতার’ কাজটি হয়েছিলো দুর্দান্ত। অপরাজিতায় আমি সবাইকে যেভাবে সাজিয়েছি, ঠিক সেভাবে অন্যান্য টিভিসি এবং নাটকে আমার ফ্যাশন পরিকল্পনা অন্যকে কপি করতেও দেখেছি। ভারতের জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী উষা গাঙ্গুলির সঙ্গে আমার কাজের সুযোগ হয়। নাগরিকের একটি নাটকে সেই সুযোগটি আমি পেয়েছিলাম। হইচই এর একটি ওয়েব সিরিজ ‘১৯৭১,’ এটার পোশাক পরিকল্পনা করেছি।

সাজিয়া লুবনা আফরিন

‘ফাগুন হাওয়ায়’ যেটা নিয়ে এতো তোলপাড়, এটার বিশেষত্ব ঠিক কিসে ছিল?

১৯৫২ এর প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এর সামগ্রিক গল্প। তৌকির আহমেদ পরিচলনা করেন। এই সিনেমায় কাজ করতে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে। গবেষণায়ও করেছি রীতিমত। সোজা কথায় আমি সময়কে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রচুর ছবি দেখেছি। ভাষা শহীদদের উপর নির্মিত অনেক জাদুঘরে ঘুরেছি। রাজারবাগে রয়েছে পুলিশের জাদুঘর সেখানে সময় ধরে ধরে পুলিশের ছবি সংরক্ষণ করা আছে, ওইসব ছবি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। ১৯৫২ এ পুলিশের পোশাকে লেখা থাকতো ‘ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ।’ এইসব তথ্য দিয়ে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে জাদুঘরে রাখা ছবিগুলো। ফোনে কথা বলেছি সে সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে। সেতু আজাদ যিনি ‘ফাগুন হাওয়ায়’ পুলিশ অফিসারের ভুমিকায় অভিনয় করেছেন, তার বাবা ছিলেন কাছাকাছি সময়ের পুলিশ অফিসার। সেতু আজাদ আমাকে অনেক তথ্য, পুরোনো অ্যালবামের ছবি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তৌকির ভাই আমাকে বলেছেন, পোশাক, সাজসজ্জা একেবারেই মাইল্ড করতে। আমি তিশাকে পরিয়েছি সুতি, খাদি, তাঁতের খুব হালকা পাতলা শাড়ি, হালকা রঙয়ের। গয়না খুব ছোট ছোট বাছাই করেছি। সিয়ামকে ঢোলা প্যান্ট, শার্ট পরিয়েছি। ব্যাগটাও একেবারে ঢোলা। পুরোনো অ্যালবামগুলো থেকে বেশ আইডিয়া পেয়েছি। শাড়ি দিয়ে সাহায্য করেছেন আমার শাশুড়ি, বন্ধুর মায়েরা, ওয়াহিদা মল্লিক জলি আপাসহ আরও অনেকে। পাইকগাছার এক গ্রামে ছিলাম ১৭ দিন। মোটকথা কাজটাকে আমি ভীষণ যত্ন করে করেছি, ভালোবেসে। খুঁতগুলো নিজে নিজেই জাজ করেছি। তবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ আমাকে কাজের অনুপ্রেরণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামনে আরও ভালো কাজ করার ইচ্ছা আছে।

সাজিয়া লুবনা আফরিন

সাফল্য পেতে স্বার্থহীন কিছু অনুপ্রেরণার জায়গার প্রয়োজন…

হ্যাঁ আমার ক্ষেত্রেও আছে, তা হলো আমার পরিবার। আমি যৌথ পরিবারে থাকি, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, ছেলে-মেয়েরা ভীষণভাবে আমাকে সাহায্য সহযোগিতা করে। আমাকে ভালোবাসে বলেই আমার কাজগুলোকে সম্মান করে। আমার শ্বশুর চান আমি সবসময় অন্যরকম কিছু করে দেখাই, আমার স্বপ্নের জায়গাগুলোকে তিনি দারুণভাবে গুরুত্ব দেন। আমার কাছে মনে হয় সবাই আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। একপেশে ভালোবাসাগুলো একাধারে পেয়ে যাচ্ছি।

জীবনে আকাঙ্ক্ষা বেড়েই চলে। যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাওয়া হলো, এখন ভাবনাগুলো কেমন?

আসলে স্বপ্ন ছিল একটি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবো’ বিধাতা সে স্বপ্ন পূরণ করেছেন। এখন দেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারি এমন কিছু করতে চাই, তা দেশে কিংবা দেশের বাইরে। আর পোশাক পরিকল্পনার উপর ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছা আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *